পাবলিক স্পিকিং -এ আর নয় ভয়!

আপডেট: 2019-04-20 12:51:46

আমাদের শিক্ষা, যোগ্যতা, জ্ঞান এসবের সঠিক মূল্য থাকে না যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা নিজেদেরকে অন্যের মনে উপস্থাপন করতে পারি। শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র সব জায়গা আজ তাদেরকেই খুঁজছে যারা নিজেদেরকে সবার সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারে অর্থাৎ যারা পাবলিক স্পিকিং এ দক্ষ। কিন্তু এই পাবলিক স্পিকিং অনেকের জন্যই ভীষণ ভয়ের কারণ। জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলার জন্য, নিজের কর্মকে পরিচিতি দেওয়ার জন্য, স্বপরিচয়কে সকলের সামনে তুলে ধরার একটি মাধ্যম, একটি অনিবার্য পথ হলো পাবলিক স্পিকিং। কিন্তু এই ভয় কেটে উঠে নিজেকে সবার সামনে উপস্থাপন করা অনেকের কাছে বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য এই ভীতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের জন্যে  অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

সঠিক পরিকল্পনা :

যে কোন বিষয়ে বক্তব্য রাখতে হলে আমাদের প্রথম প্রয়োজন সে বিষয়ে সঠিক ভাবে পরিকল্পনা করেরাখা, কথা গুলো মনে মনে গুছিয়ে রাখা।

কি কি বলতে হবে, কিভাবে বলব, কি পয়েন্ট, পাঞ্চ লাইন এমন সব কিছুই আগে থেকে সঠিক ভাবেপরিকল্পনা অনুযায়ী সাজায় নিলে পরে সবার সামনে গিয়ে ভয় বা নার্ভাসনেস এর জন্য কথা মাথায় নাআসার রিস্ক থাকে না।

এক্ষেত্রে বিষয়টির মূল বিষয়বস্তু সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে রাখা যায় কিন্তু পুরোটাই মুখস্থ করা যাবে নাএকেবারেই। মূল পয়েন্ট গুলো মনে রাখলেই সেগুলো কাজে দেবে।

কথা বলার একটি ধরণ তৈরী করুন :

অনেক সময় এক সাথে অনেক কথা বলতে গিয়ে আমরা কথা গুলো এলোমেলো করে ফেলি। কোনকথার পর কোন কথা বললে মানুষ কথাগুলার মধ্যে ভালো মতো সম্পর্ক খুঁজে পেত, সেদিকে খেয়ালথাকে না।

এজন্য প্রয়োজন নিজের কথা বলার প্যাটার্ন বেছে নেওয়া।

বিষয়বস্তুর ওপর ফোকাস করে, প্রথমে ‘সমস্যা’, তারপর ‘কারণ’, শেষে ‘সমাধান’ এভাবে প্যাটার্ন অনুযায়ী সাজায় নিয়ে কথা বললে শ্রোতারা সেখানে আগ্রহ খুঁজে পাবে।

সেই সাথে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হারিয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকবে না।

 

ভয় দূর করা এবং নিজেকে শান্ত রাখা :

পাবলিক স্পিকিং এ সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ভয়। এমনকি ধরেন বাফেটও একসময় পাবলিক স্পিকিংএ ভয় পেতেন। কিভাবে বলব, কি বলব, সবাই কি ভাববে এই সব চিন্তা করতে করতে আমরামানসিক-ভাবে দুর্বল হয়ে পরি। এতে করে বেশিরভাগ সময় আমাদের শ্বাস– প্রশ্বাস ও বেড়ে যায়।ভয়ে গুছিয়ে নেওয়া কথাগুলোও হারিয়ে যায়। এজন্য আমি কথা বলতে পারি না এসব না, ভেবেভয়কে দূরে সরিয়ে নিজেকে শান্ত করে টপিক আর কি কি বলতে বলতে এসবের দিক খেয়াল রাখাবেশি প্রয়োজন।

 

চর্চা, চর্চা, চর্চা :

যে কোনো কাজ প্রথমবার করতে গেলে সবারই ভয় লাগে কিন্তু যে কাজ বার বার করা হয় সে কাজনিয়ে কোনো আশংকা, ভয় থাকে না। পাবলিক স্পিকিং–এ ও ভয় দূর করার সবচেয়ে বড় উপায় হলবার বার চর্চা।

কথাগুলোকে গুছিয়ে নিয়ে তা নিজে নিজে বার বার বললে বিশেষ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েনিজের অঙ্গ ভঙ্গি খেয়াল করলে আরও ভাল হয়। এক্ষেত্রে আমরা কোনো বন্ধু বা পরিবার বা কাছেরকারো সামনে বলে দেখতে পারি, এতে করে তারা আমাদের ভুল গুলো ধরিয়ে দিতে পারেন।

 

শরীর-চর্চা ও হালকা ব্যায়াম:

বক্তব্যের পূর্বে ভয়, চিন্তা, উদ্বেগ, অস্থিরতা এসব কাটানোর একটি অন্যতম কার্যকরী পন্থা হচ্ছেশরীর-চর্চা। এটি হতে পারে বক্তব্যের ১০–১৫ মিনিট আগে সামান্য হাঁটা, হাতের ঘাড়ের ব্যায়াম।ব্যায়ামের মাধ্যমে সারা শরীরে রক্তের সঞ্চালন সঠিকভাবে হয় এতে করে ব্রেইনেও অক্সিজেনঠিকমতো পৌঁছায়।  তাহলে বক্তব্য পূর্বের ভয়, অস্থিরতা, চিন্তা অনেকটা কমে যায়। সামান্য শরীর-চর্চা এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখে।

 

শ্রোতাদেরকে বক্তব্যের সাথে সংযুক্ত করুন :

বক্তব্যের শুরুতেই যদি শ্রোতাদের আপনার সাথে সংযুক্ত করে তা ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে পরেতা ফিরায় আনা কঠিন হয়ে পরে।এজন্য এমন কোনো কথা দিয়ে শুরু করা উচিত যার মাধ্যমেশ্রোতারা আগ্রহবোধ করে বা চমকে যায়। তাহলে পুরো সময়টাই তাদের মনোযোগ থাকবে।

১। শ্রোতাদের ধরে রাখার জন্যে কথার মাঝে সেই বিষয়ের কিছু প্রশ্ন করা যায়।

২। সেই বিষয়-ভিত্তিক কাজে ছোট ছোট গ্রুপ করে কাজ দেওয়া যায়।

৩। দর্শকদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেও তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা যায়। নিজের বক্তব্যকে জোরালো রাখতে হবে।

৪। এজন্য ‘সত্যি বলতে’,  ‘মনে হয়’ এই ধরনের শব্দ সন্দেহ তৈরী করে। তাই এগুলো ব্যবহার না করাই ভাল।

 

অঙ্গভঙ্গি :

পাবলিক স্পিকিং এর প্রধান একটা বিষয় হল অঙ্গভঙ্গি।

১। কোন লাইনের সাথে কিভাবে হাত নাড়াতে হবে বা কিভাবে হাটতে হবে বা কাদের দিকে তাকাতে হবে এসব দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

২। কথা বলা সময় শুধু একজায়গায় দাঁড়িয়ে না থেকে হালকা হাঁটাহাঁটি করলে ভালো হয়। কিন্তু কোনো ধরণের অশ্লীল বা কটু ভঙ্গি করা যাবে না।

৩। নিজের আচরণ দিয়ে বোঝাতে হবে যে আপনি যা বলছেন সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিত। এতে শ্রোতাদের মধ্যে যেন বিশ্বাস তৈরী হয়।

৪। বক্তব্য রাখার সময় সোজা হয়ে দাঁড়ানো, হালকা হাসি দেওয়া, পায়ের ওপর ভর না দিয়ে দাঁড়ানো, কোমরে হাত না দেওয়া, কোনো কিছুর পেছনে না দাঁড়িয়ে সবার সামনে এসে কথা এদিকগুলোতে খেয়াল রাখতে হবে।

 

নিঃশ্বাস নিন এবং ধীরে কথা বলুন :

কথা বলতে গেলে ভয় এবং অস্থিরতার জন্য সবচেয়ে বেশি যা হয় তা হলো কথা বলার সময়হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলার চেষ্টা করা হয়। এজন্য কথাগুলো বেশি  দ্রুতহয়ে যায় এবং স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। এজন্য উচিত কথার মাঝে মাঝে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিতেনিতে কথা বলা আর দ্রুত কথা না বলে সময় নিয়ে কথা বলা। আপনার উত্তেজনা এবং ভয় কোনটিইদর্শক বা শ্রোতাদের সামনে প্রকাশ করা যাবে না। আর দ্রুত কথা বললে আপনি নিঃশ্বাস নেওয়ারসময় কম পাবেন এবং নিঃশ্বাসের অভাবে আপনার ভেতরের ভয় বাড়তে থাকবে।

 

ভিডিও রেকর্ড করুন এবং দেখুন :

প্রেজেন্টেশন বা পাবলিক স্পিকিং এর আগে সবকিছু ঠিকঠাক-ভাবে করতে চাইলে আগে প্র্যাকটিসকরার সময় পুরোটা ভিডিও করে পরে পুরোটা দেখে নিলে নিজের পারফর্মেন্সের মান নিজেই বোঝাযায়। ভুলগুলো ধরতে পারবেন এবং শুধরিয়ে নিতে পারবেন।

 

পানি খান :

প্রেজেন্টেশন এর ঠিক আগে পানি খেয়ে নিন। এতে আপনার রক্ত সঞ্চালন ভালো হবে। শরীরেসতেজতা আসবে। ভয় কম হবে। দৃঢ়তা বাড়বে। আপনাকে হাসিখুসি রাখতে সাহায্য করবে। দীর্ঘসময় ধরে কথা বলার সময় আপনার গলা ভিজিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। বেভারেজ জাতীয় পানীয়খাওয়া উচিত নয়, এগুলো আপনার তৃষ্ণা বাড়াবে।

 

বিষয়বস্তু সম্পর্কে সঠিক এবং যথেষ্ট জ্ঞান রাখুন :

আপনি যে বিষয়ের ওপরই কথা বলুন না কেন সেই বিষয়ে আপনার সম্পূর্ণ জ্ঞান রাখতে হবে। সেবিষয়ের প্রতিটি তথ্য সঠিক হতে হবে।আপনি যদি জানেন আপনি সঠিক তথ্য দিচ্ছেন তাহলে এতেআপনার আত্মবিশ্বাস ঠিক থাকবে, ভয় কম লাগবে।এমনকি শ্রোতাদের কেউ কোনো প্রশ্ন করলেআপনি নির্ভয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন।  এক্ষেত্রে আর্নেস্ট হ্যামিংয়ে লিখেছিলেন,

পাবলিক স্পিকিং এর ক্ষেত্রেও বিষয়টা ঠিক তাই।

এই বিষয় গুলো মেনে চর্চা করলে যে কেউই সহজে পাবলিক স্পিকিং এর ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু একজন বাকপটু বক্তা হতে হলে আপনাকে অবশ্যই প্রতিনিয়ত চর্চা করতে হবে।তাহলেএকসময় পুরোপুরিভাবে ভয় কেটে যাবে। এক্ষেত্রে জন ফোর্ড এর একটি উক্তি মাথায় রাখা যায়,

তাই যাই বলবেন মুখস্থ করে নয় বরং নিজে থেকে বলবেন।