শ্রীলঙ্কায় হামলা: যা জানা গেছে, যা যায়নি

আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ২০:৫৫

শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে গত রোববার ছিল একটি রক্তস্নাত দিন। ভয়াবহ বোমা হামলায় এদিন কেঁপে উঠেছিল দ্বীপরাষ্ট্রটি। তিনটি গির্জা, তিনটি পাঁচ তারকা হোটেলসহ মোট আট জায়গায় করা ওই হামলায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন অন্তত ৩২০ জন, আহত হয়েছেন ৫০০। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উৎসব ইস্টার সানডে অনুষ্ঠানকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত আটটি দেশের নাগরিক।

এ ঘটনার ধাক্কা সামাল দিতে শ্রীলঙ্কার সরকার সোমবার দেশে জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেয়। সেই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীকে দেওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের স্বার্থে যেকোনো নাগরিককে গ্রেপ্তারের বিশেষ ক্ষমতা। অন্যদিকে, রাজধানী কলম্বোয় সোমবার রাতে জারি করা হয় সাময়িক কারফিউ। বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রধান প্রধান সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও বার্তা আদান-প্রদানের সাইট।

এই নারকীয় হামলার নানা খবর পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ জানা গেছে, জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে এখনো জানা যায়নি বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আসুন জেনে নিই রোববারের হামলার জানা-অজানা—

এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
• শ্রীলঙ্কার সরকার মঙ্গলবার জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে জড়িত আছে স্থানীয় স্বল্পপরিচিত দুটি জঙ্গি সংগঠন। এগুলো হলো ন্যাশনাল তৌহিদি জামায়াত ও জামিয়াতুল মিল্লাতু ইবরাহিম। দেশটির কর্তৃপক্ষ বলেছে, আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সহায়তায় হামলা চালিয়েছে তারা। অন্যদিকে, জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট ঘটনার তিন দিন পর তাদের মুখপাত্র আমাকের মাধ্যমে হামলার দায় স্বীকার করেছে। যদিও হামলার ব্যাপারে কোনো প্রমাণ দেয়নি আইএস।

বোমা হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত একটি গির্জা। নেগোম্বো, শ্রীলঙ্কা, ২১ এপ্রিল। ছবি: রয়টার্সবোমা হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত একটি গির্জা। নেগোম্বো, শ্রীলঙ্কা, ২১ এপ্রিল। ছবি: রয়টার্স• ন্যাশনাল তৌহিদি জামায়াতের প্রধান মোহাম্মাদ জাহারান। জাহারান একজন চিহ্নিত চরমপন্থী, যিনি ভারত ও শ্রীলঙ্কায় তাঁর অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জাহারান অনলাইনে বিদ্বেষপূর্ণ বার্তা ছড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।

• নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হওয়া হামলার প্রতিশোধ নিতে শ্রীলঙ্কায় হামলা হয়েছে বলে পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তৃতায় জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান বিজেবর্ধন। এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে এর সপক্ষে কোনো উদ্ধৃতি বা সাক্ষ্য উপস্থাপন করেননি তিনি।

• শ্রীলঙ্কার সরকার স্বীকার করেছে, এ হামলার ১০ দিন আগেই তারা একটি বিদেশি গোয়েন্দা বাহিনী থেকে সতর্কবার্তা পেয়েছিল। ওই বিদেশি গোয়েন্দা বাহিনী জানিয়েছিল, ন্যাশনাল তৌহিদি জামায়াত দেশটির বিভিন্ন গির্জা লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে। সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও হামলা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে না পারাকে শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দা বাহিনীর বিশাল ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

যিশুর মূর্তির গায়ে রক্তের দাগ। নেগোম্বো, শ্রীলঙ্কা, ২১ এপ্রিল। ছবি: রয়টার্সযিশুর মূর্তির গায়ে রক্তের দাগ। নেগোম্বো, শ্রীলঙ্কা, ২১ এপ্রিল। ছবি: রয়টার্স• হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত ২৪ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। মঙ্গলবার নাগাদ গ্রেপ্তারের সংখ্যা হয়েছে ৪০। বলা হচ্ছে, তৌহিদি জামায়াত নামের গোষ্ঠীটির ওপর সরকারের সার্বক্ষণিক নজর রয়েছে।

• ফরেনসিক পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যের বরাতে বলা হচ্ছে, রোববারের হামলাগুলোর অধিকাংশ একক ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। তবে কলম্বোর শাংগ্রি-লা হোটেলে দুজন হামলা করেছিল।

হামলা ও নিহতদের ব্যাপারে যা জানা গেছে 
• রোববার সকালে দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কার তিনটি পৃথক শহরে বোমা হামলা হয়। প্রথমে তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর রোববার বিকেলে রাজধানী কলম্বো ও এর আশপাশে আরও দুটি হামলা হয়। 
• সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়েছে কলম্বো থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে নেগোম্বোর সেন্ট সেবাস্তিয়ান গির্জায়। ওই গির্জায় অন্তত ১০৪ জন নিহত হয়েছেন। 
• দেশটির কর্তৃপক্ষ বলছে, কমপক্ষে ৩৮ জন বিদেশি এই হামলায় নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছে।

এখনো যা জানা যায়নি
• কীভাবে দুটি ছোট ও প্রায় অপরিচিত জঙ্গি দল এত বড় ও সুপরিকল্পিত হামলা চালাতে সক্ষম হলো, তা এখনো জানতে পারেনি শ্রীলঙ্কার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 
• আন্তর্জাতিক এক বা একাধিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক যদি রোববারের হামলায় জড়িত থেকেও থাকে, তাহলে তা কী পরিমাণে সাহায্য করেছে, সেটি এখনো অজানা। 
• আত্মঘাতী হামলাকারী ও জড়িত থাকার সন্দেহে আটক হওয়া ওই ২৪ জনের পরিচয় এখনো প্রকাশ করেনি শ্রীলঙ্কার সরকার। 
• একটি সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও কেন দেশটির সরকার হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থ হলো, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। 
• হামলা প্রতিরোধের ব্যর্থতা সরকারের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে এরই মধ্যে জল্পনা শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করেছে। 
• হামলায় আহত ব্যক্তিদের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে কতজনের অবস্থা সংকটজনক, তা জানা যায়নি।